বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) ২০২৫-২৬ মৌসুমে নতুন পরিচয় ও উদ্যমে ফিরে আসছে চট্টগ্রামভিত্তিক ফ্র্যানচাইজিটি। পূর্বতন ‘চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স’ এখন ‘চট্টগ্রাম রয়্যালস’ নামে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। কেবল নামেই নয়, দলগত কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রেও তারা এনেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। গত কয়েকটি আসরে অসন্তোষজনক ফলাফলের পর, এবারের দল গঠনে রয়্যালস的管理পরিচালনা বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে তৈরি হয়েছে একটি সম্ভাবনাময় ও ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড। ড্রাফটে সর্বোচ্চ মূল্যের দেশি খেলোয়াড়কে কিনে নিয়ে এবং কিছু স্মার্ট ও কৌশলগত ডিরেক্ট সাইনিংয়ের মাধ্যমে তারা এমন একটি দল গড়ে তুলেছে যা আসন্ন মৌসুমে শিরোপার দাবিদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। দলটির ঘরের মাঠ জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের স্পিন-বান্ধব পিচের বৈশিষ্ট্যকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই এই স্কোয়াড ডিজাইন করা হয়েছে। নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো চট্টগ্রাম রয়্যালসের ২০২৬ সংস্করণের খেলোয়াড় তালিকা, দলগত কৌশল ও সম্ভাবনা।
চট্টগ্রাম রয়্যালস খেলোয়াড় তালিকা ২০২৬
লিগের ১২তম আসরে অংশ নেওয়া চট্টগ্রাম রয়্যালস তাদের দল গঠনের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি খেলোয়াড়ের একটি সমন্বিত ও কার্যকর মিশ্রণ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। দলের ভারসাম্য রক্ষা, নির্দিষ্ট ভূমিকা পালনকারী খেলোয়াড় নির্বাচন এবং স্থানীয় পিচের অবস্থার প্রতি খেয়াল রেখেই এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। নিচের সারণিতে দলের পূর্ণাঙ্গ তালিকা উপস্থাপন করা হলো:
| খেলোয়াড়ের নাম | জাতীয়তা | ভূমিকা (রোল) | অধিগ্রহণের পদ্ধতি | মূল্য (টাকা/ডলার) |
|---|---|---|---|---|
| শেখ মেহেদী হাসান | বাংলাদেশ | অফ-স্পিন অলরাউন্ডার (ব্যাটিং + বোলিং) | ডিরেক্ট সাইনিং | – |
| তানভীর ইসলাম | বাংলাদেশ | স্লো লেফট-আর্ম অর্থোডক্স স্পিনার | ডিরেক্ট সাইনিং | – |
| আবরার আহমেদ | পাকিস্তান | লেগ-স্পিনার (মিস্ট্রি স্পিনার) | ডিরেক্ট সাইনিং | – |
| মোহাম্মদ নাঈম শেখ | বাংলাদেশ | ওপেনিং ব্যাটার | ড্রাফট (A+ ক্যাটাগরি) | ১ কোটি ১০ লাখ টাকা |
| শরিফুল ইসলাম | বাংলাদেশ | লেফট-আর্ম ফাস্ট বোলার | ড্রাফট | ৪৪ লাখ টাকা |
| মাহমুদুল হাসান জয় | বাংলাদেশ | টপ-অর্ডার ব্যাটার | ড্রাফট | ৩৭ লাখ টাকা |
| মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধ | বাংলাদেশ | রাইট-আর্ম ফাস্ট-মিডিয়াম বোলার | ড্রাফট | ৩৩ লাখ টাকা |
| সুমন খান | বাংলাদেশ | লেফট-আর্ম ফাস্ট-মিডিয়াম বোলার | ড্রাফট | ৩২ লাখ টাকা |
| জিয়াউর রহমান | বাংলাদেশ | ব্যাটিং অলরাউন্ডার + মিডিয়াম পেসার | ড্রাফট | ৩০ লাখ টাকা |
| আবু হায়দার রনি | বাংলাদেশ | লেফট-আর্ম ফাস্ট-মিডিয়াম বোলার | ড্রাফট | ২২ লাখ টাকা |
| নিরোসান ডিকওয়েলা | শ্রীলঙ্কা | ওপেনিং ব্যাটার + উইকেটকিপার | ড্রাফট (বিদেশি) | ৩৫,০০০ ডলার |
| অ্যাঞ্জেলো পেরেরা | শ্রীলঙ্কা | মিডল-অর্ডার ব্যাটার + পার্টটাইম লেগস্পিন | ড্রাফট (বিদেশি) | ২০,০০০ ডলার |
| আরাফাত সানি | বাংলাদেশ | স্লো লেফট-আর্ম অর্থোডক্স স্পিনার | ড্রাফট | ১৮ লাখ টাকা |
| শুভাগত হোম | বাংলাদেশ | অফ-স্পিনার + লোয়ার-অর্ডার ব্যাটার | ড্রাফট | ১৪ লাখ টাকা |
| সালমান হোসেন | বাংলাদেশ | মিডল-অর্ডার ব্যাটার | ড্রাফট | ১৪ লাখ টাকা |
| জাহিদুজ্জামান খান | বাংলাদেশ | রাইট-আর্ম ফাস্ট-মিডিয়াম বোলার | ড্রাফট | ১১ লাখ টাকা |
এই তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দলটি স্থানীয় পিচের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্পিন বিভাগে বিপুল সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। একই সাথে, পেস বোলিং এবং ব্যাটিং লাইনআপেও তারা যথেষ্ট গভীরতা নিশ্চিত করতে পেরেছে।
আরও জানতে পারেনঃ যুব এশিয়া কাপ ২০২৫: পূর্ণাঙ্গ সূচি, বাংলাদেশের ম্যাচ ও গ্রুপচট্টগ্রাম রয়্যালসের ড্রাফট থেকে কেনা দেশি খেলোয়াড়
চট্টগ্রাম রয়্যালস এবারের ড্রাফটে তাদের বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যয় করেছে তরুন ওপেনিং ব্যাটার মোহাম্মদ নাঈম শেখ-এর জন্য। তাকে এ+ ক্যাটাগরি থেকে ১ কোটি ১০ লাখ টাকায় কিনে তারা তাদের ব্যাটিং লাইনআপের ভিত্তি মজবুত করেছে। নাঈম জাতীয় দলে তার সীমিত সুযোগে ইতিমধ্যেই আক্রমণাত্মক স্ট্রোক প্লের দক্ষতা দেখিয়েছেন, যা পাওয়ারপ্লে ওভারগুলোতে রয়্যালসের জন্য অমূল্য সম্পদ হতে পারে। ড্রাফটে অর্জিত অন্যান্য দেশি খেলোয়াড়দের তালিকা ও মূল্য নিম্নরূপ:
-
মোহাম্মদ নাঈম শেখ – ১ কোটি ১০ লাখ টাকা
-
শরিফুল ইসলাম – ৪৪ লাখ টাকা
-
মাহমুদুল হাসান জয় – ৩৭ লাখ টাকা
-
মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধ – ৩৩ লাখ টাকা
-
সুমন খান – ৩২ লাখ টাকা
-
জিয়াউর রহমান – ৩০ লাখ টাকা
-
আবু হায়দার রনি – ২২ লাখ টাকা
-
আরাফাত সানি – ১৮ লাখ টাকা
-
শুভাগত হোম – ১৪ লাখ টাকা
-
সালমান হোসেন – ১৪ লাখ টাকা
-
জাহিদুজ্জামান খান – ১১ লাখ টাকা
এই সংগ্রহে স্পিন বিভাগ বিশেষভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। শুভাগত হোম (অফ-স্পিন) এবং আরাফাত সানি (লেফট-আর্ম অর্থোডক্স) ড্রাফট থেকে এসেছেন, যারা ডিরেক্ট সাইনিং করা তানভীর ইসলাম-এর সাথে মিলে তিনটি ভিন্ন ধাঁচের স্পিন বিকল্প তৈরি করেছেন। পেস বোলিং বিভাগেও শরিফুল ইসলাম, মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধ, সুমন খান ও আবু হায়দার রনি-এর মতো তরুন ও জাতীয় দলের কাছাকাছি থাকা বোলারদের সংগ্রহ দলকে ভালো গভীরতা দিয়েছে।
বিদেশি খেলোয়াড় (ড্রাফট থেকে)
বিদেশি খেলোয়াড়দের কোটায় চট্টগ্রাম রয়্যালস দুজন অভিজ্ঞ শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটারকে বেছে নিয়েছে, যাদের উভয়েরই বিপিএলে আগে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে:
-
নিরোসান ডিকওয়েলা (৩৫,০০০ ডলার): এই আগ্রাসী ওপেনিং ব্যাটসম্যান兼 উইকেটকিপার লিগের বিভিন্ন দলের হয়ে খেলেছেন। তার বিধ্বংসী স্ট্রোক প্লে দলের জন্য দ্রুত সূচনা নিশ্চিত করতে পারে, এবং উইকেটের পিছনের দায়িত্ব নেওয়ায় দলে একটি বিশেষজ্ঞ ভূমিকা পূর্ণ হবে।
-
অ্যাঞ্জেলো পেরেরা (২০,০০০ ডলার): একজন স্থিতিশীল মিডল-অর্ডার ব্যাটসম্যান যিনি প্রয়োজনে পার্টটাইম লেগ-স্পিন বোলিংও করতে পারেন। তার অভিজ্ঞতা মাঝারি ওভারগুলিতে দলকে স্থিতিশীলতা দিতে পারে এবং তিনি ফিনিশার হিসেবেও ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
ডিরেক্ট সাইনিং: কৌশলগত মাস্টারস্ট্রোক
ডিরেক্ট সাইনিং-এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম রয়্যালস তাদের দলের মেরুদণ্ড তৈরি করতে বেশ কয়েকটি চালাকি ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা তাদের দলকে অনন্য উচ্চতা দিতে পারে।
দেশি ডিরেক্ট সাইনিং:
-
শেখ মেহেদী হাসান: বাংলাদেশের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন। তার অফ-স্পিন বোলিং চট্টগ্রামের পিচে অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে, এবং নিচের অর্ডারে তার দ্রুত রান সংগ্রহ করার ক্ষমতা দলের ব্যাটিং গভীরতা বৃদ্ধি করবে। তিনি দলের সম্ভাব্য নেতৃত্বদাতাদেরও একজন।
-
তানভীর ইসলাম: গত দু’টি বিপিএল মৌসুমে তিনি নিজেকে একজন শীর্ষস্থানীয় অর্থোডক্স স্পিনার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের পিচ তার বোলিংয়ের জন্য আদর্শ। মধ্যম ওভারগুলোতে রান নিয়ন্ত্রণ এবং উইকেট শিকারে তার ভূমিকা দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশি ডিরেক্ট সাইনিং:
-
আবরার আহমেদ (পাকিস্তান): এই সাইনিংটি হয়তো দলের সবচেয়ে বড় ট্রাম্প কার্ড। পাকিস্তানের এই মিস্ট্রি বা লেগ-স্পিনার প্রথমবারের মতো বিপিএলে খেলবেন। তার অনন্য গুগলি, ফ্লিপার এবং ভেরিয়েশনের কারণে তিনি মিডল ওভারে বিপিএলের ব্যাটসম্যানদের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারেন। চট্টগ্রামের পিচে তার বোলিং আরও বেশি কার্যকর হতে পারে।
চট্টগ্রাম রয়্যালসের সম্ভাব্য সেরা একাদশ
দলের সকল প্রধান খেলোয়াড় ফিট ও ফর্মে থাকলে, চট্টগ্রাম রয়্যালসের সম্ভাব্য সেরা একাদশ নিম্নরূপ হতে পারে:
-
মোহাম্মদ নাঈম শেখ (ওপেনার)
-
নিরোসান ডিকওয়েলা (ওপেনার兼 উইকেটকিপার)
-
মাহমুদুল হাসান জয় (নং ৩ ব্যাটার)
-
শেখ মেহেদী হাসান (অলরাউন্ডার)
-
অ্যাঞ্জেলো পেরেরা (মিডল-অর্ডার ব্যাটার)
-
জিয়াউর রহমান (অলরাউন্ডার)
-
সুমন খান / শুভাগত হোম (পেসার / স্পিনার – পিচের অবস্থা অনুযায়ী)
-
তানভীর ইসলাম (স্পিনার)
-
আবরার আহমেদ (স্পিনার)
-
শরিফুল ইসলাম (পেসার)
-
মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধ (পেসার)
এই একাদশটি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি শক্তিশালী দিক চোখে পড়ে। প্রথমত, স্পিন বিভাগের অসাধারণ সমৃদ্ধি। শেখ মেহেদী, তানভীর ইসলাম, আবরার আহমেদ, শুভাগত হোম, আরাফাত সানি (১২তম জন হিসেবে) এবং অ্যাঞ্জেলো পেরেরা—মোট ছয়জন স্পিন বিকল্প রয়েছে দলের হাতে। চট্টগ্রামের স্পিন-বান্ধব উইকেটে এটি একটি মারাত্মক অস্ত্র, যা অধিনায়ককে ম্যাচের গতিপথ পরিবর্তনের জন্য বহুমুখী অপশন দেবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাটিং লাইনআপে আগ্রাসী ওপেনিং জুটি (নাঈম ও ডিকওয়েলা) এবং মিডল অর্ডারে স্থিতিশীলতা ও ফিনিশিং ক্ষমতা (জয়, মেহেদী, পেরেরা) রয়েছে। তৃতীয়ত, পেস অ্যাটাকে বামহাতি-ডানহাতি বৈচিত্র্য (শরিফুল, সুমন, রনি – বামহাতি; মুগ্ধ – ডানহাতি) নিশ্চিত করা হয়েছে।
উপসংহার: শিরোপার দাবিদার হয়ে ওঠার পথে
কাগজে-কলমে বিবেচনা করলে, চট্টগ্রাম রয়্যালস বিপিএল ২০২৬-এর জন্য একটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত, ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিস্থিতি উপযোগী দল গঠন করতে পেরেছে। শুধু নাম পরিবর্তন নয়, তাদের দল গঠনের দর্শনেও এসেছে ইতিবাচক রূপান্তর। বিশেষ করে শেখ মেহেদী হাসান, তানভীর ইসলাম ও আবরার আহমেদ—এই স্পিন ত্রয়ী চট্টগ্রামের ঘরের মাঠের ম্যাচগুলোতে প্রতিপক্ষের জন্য বিরাট মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাদের সমন্বিত আক্রমণ দলকে সেইসব ম্যাচে প্রায় অপরাজেয় করে তুলতে সক্ষম।
সফলতার চাবিকাঠি নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের উপর: মোহাম্মদ নাঈম ও নিরোসান ডিকওয়েলা-র মতো ওপেনারদের পাওয়ারপ্লেতে দ্রুত ও স্থায়ী সূচনা দেওয়ার ক্ষমতা; শেখ মেহেদী-র মতো অলরাউন্ডারদের ব্যাট ও বল—দুই বিভাগেই সামগ্রিক অবদান; এবং পেস বোলারদের প্রাথমিক ও শেষের ওভারগুলোতে কার্যকর ভূমিকা পালন। যদি এই উপাদানগুলো একসাথে কাজ করে এবং দলটি তাদের ঘরের মাঠের সুবিধাকে পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে চট্টগ্রাম রয়্যালস কেবল প্লে-অফেই জায়গা করে নেবে না, বরং এবারের বিপিএল শিরোপার অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পূর্ণ সম্ভাবনা রাখে। একটি সুগঠিত পরিকল্পনা ও কৌশল নিয়ে আত্মপ্রকাশ করা এই দলটি আসন্ন মৌসুমে নিশ্চিতভাবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
